ঘষা কাচের জারণ কথা
দুটি পারস্পরিক বিপরীতার্থক বিন্দু একই সরলরেখায় সমান্তরালে
অবস্থান করে
তাহলে উভয়ের আপেক্ষিক গ্রহণযোগ্যতা শূন্যে পর্যবসিত ।সেই
শূণ্যের মাঝেই
বিচরণ এবং জাগতিক
নিস্ক্রমণের অপেক্ষায়..আসলে, একটি বৃত্তের অন্তর্গতে থাকে আরো অসংখ্য অদৃশ্য বৃত্ত ।যা মূল বৃত্তটিকে সম্পূর্ণ করে ।যদি কখনো তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ,দেখা
যাবে
দৃশ্যবৎ বলয়টি তার অপচ্ছায়া মাত্র । হায় ! চারিদিকে লক্ষ
লক্ষ...কোটি কোটি ভিড় বাঁচিয়ে নিভৃতে আপন সাধনায় মগ্ন, ব্রাত্য
মানুষটিকে খুঁজে বেড়াই যার স্পর্শে আবার ঋদ্ধ হয়ে উঠবে বাংলা কবিতা । কোথায় পাবো তাঁরে ! কোনখানে !
শুরুটা এরকম হলেও তার শেষটা জানা নেই এখনো । হয়তো কোনো
একদিন...তাই অপেক্ষা আমাদের ...
ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম, যদি ঘুম না ভাঙতো _ বেশ
মজা হতো ...আমার চারপাশে শালিক চড়াইয়ের ভিড়ে , উড়ে
উড়ে সবুজ নীলের ভোজে কব্জি ডুবে যাওয়া চীৎকার দেখি
চুপ করে এককোনে নীচু হয়ে হামাগুড়ি দেয়।বৃষ্টিতে মিশে যাচ্ছে শিরীষ
ফুল আর মাটির সোঁদা গন্ধ ।মাঝে মাঝেই ঝাঁপসায় হারিয়েছে
কিছু মুখ ।মনে এলেও,খুঁজে আসে না ।বিশ্বাস হয় না , তাঁদের আর পাওয়া যাবে না কোনোদিন ।কোনোখানেই ।কোনোদিন এই ঝাঁপসা বৃষ্টিই
আয়নায় চকচক করে উঠবে না
...শরতের মতো । তবু এক টুকরো কাঁচের ছবি হিরের ঝলক আনে কখনো কখনো ।অসংখ্য বৃত্তের ,প্রতিটি বৃত্তই স্বয়ং সম্পূর্ণ ।সেখানে রবাহূত,অবাঞ্ছিতদের ম্রিয়মান হতেই হয় ।প্রবেশের ভুলে ।
প্রায় দু’দশক
কোনো লেখা নেই ।কবিতা শব্দটি অস্তিত্ত্বহীন ।সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।লিটিল ম্যাগ,বাঙলা
কবিতা।এমন কি কবি বন্ধুরাও ।বুঝেছিলাম কবিতা ছাড়াও বাঁচা যায় মেহনতি মানুষের মতো।আজকাল
কাগজ কলম নিয়ে লিখতে খুব বিরক্ত লাগে ।কাউকে চিঠি লিখি নি কতবছর, সে
আর মনে নেই।ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এসে এই সুবিধাটা হয়েছে,কাগজ পেন লাগে না।
কখনো ভুলে যাই ।এই
করে অনেক কবিতাই হারিয়ে গেছে ।স্মৃতি থেকে ২/৪ টি উদ্ধার
করা গেছে ।
বুনো শুয়োর আর সদ্য লেজবিহীন মানুষের গল্প শুনতে শুনতে শুনতে...শক্ত হয়ে ওঠে হাতের পেশী,
লম্বা নখ,আর লাল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকি একে অন্যে
দিকে..অসাধারণ একটি কবিতা পাঠের আশায় প্রতি রাতে জেগে থাকি, মাঝরাত
অবধি ~শেষে ক্লান্তি তে ঘুম আসে ...
সম্মানহীন রাজনৈতিক টানাপোড়েন ।পদের
আস্ফালন।মিথ্যে প্রতিশ্রুতি।হাওয়াই চপ্পলের মতো পাতার সিংহাসন - গড়িয়ে গড়িয়ে নেমেছে
রাস্তায়।গ্রামের মাঝখান দিয়ে যায় শূর্পনখার
দুইকান... তবু এর ভেতরেই গ্রাম ঢুকে থাকে হেঁসেলে ।ঢাকনা উল্টে...ভিড় করা ফিসফিস
জঙ্গল খেলতে খেলতে ফুলঝুরি করে ফেলে গাঁ ।ওঁত পেতে রাখা পথ ছেড়ে বাদাড় হয়েছে উঁকি।শেয়ালের লেজের আপস ৩ মাথা আর ১ টির যোগ-সাজসেই ।
বর্ষার জল যখন আমাদের বাড়ির পিছনের মজা খাল ভর্তি হয়ে সঞ্জয়দের বাগানে থৈ থৈ করতো সবুজ ঘাসের ওপর , তখন আমাদের দুই ভাইয়ের কচি পায়ের পাতার
আসেপাশে
চুনো চুনো পুঁটি , খলসের লুকোচুরি , উল্লাস ... ফিকে আসা ঘোলা জলের সবুজ ঘাসে ,
ধরাছোঁয়ার বাইরে ।আর অবাক
হয়ে দেখতাম , বিশাল আকারের বজরা মতো নৌকা এসে ভিড়তো ঘাটে । তার গলুই থেকে
বেরিয়ে
আসতো কালো কালো মানুষ ।
কালনা থেকে কাঁচা কয়লার স্তুপ নিয়ে । তবু
বাড়ি ফিরতে হতো ঝিরঝিরে
বৃষ্টিতেই - মায়ের হাতের ডালপুরি আর সিঙারার টানে
... ইস্কুল থেকে ফিরতাম গুড়-ছোলা খেতে খেতে ।ঠিক বাড়ি ফিরতাম না , রাস্তার
উঁচু
ঢিবি থেকে গড়িয়ে নেমে আসতাম মরা নদীর সোঁতায় ।আমি , বাঘা
আর নারাণ ।ক্লাস
ফোরের ছাত্র তখন।বালি
মাড়িয়ে ছুটতাম পশ্চিম কোনের একটি জায়গার আকর্ষণে । চারপাশে বড় হাঁড়ি মতো কাঁধা উঁচু এক
গহ্বর ,
যার একদিক খোলা অংশটি মিশেছে
নদীতে । আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখতাম গহ্বরটিতে স্বচ্ছ জলের স্রোত নেমে আসছে মাটি ,
বালি ভেদ করে ।নিরন্তর
।অবিচ্ছিন্ন ।ঐ ২/৩টি ছিদ্রের অবিশ্রান্ত জলপ্রবাহের আশ্চর্য
আকর্ষণীয় শক্তিতে আমাদের ঘন্টার পর ঘন্টা জলাঞ্জলী দিয়ে সন্ধ্যে মুখো
বাড়ী ফিরলে , কপালে জুটতো বকুনি আর মার ।আর
আজকাল বঁড়শিতে সুতো বাঁধা ও ভুলে গেছি.. বহু চেষ্টায় সেটা হল তো..
ফাতনা চার
এসবের ঝামেলায় দুপুর গড়িয়ে গেল... পিকাইয়ের বায়নাক্কায় ।
যেতেই হল
খাল পাড়ে।কয়েক ঘণ্টা লুকোচুরির পরেও পিকাইয়ের
সযত্নে বানানো ময়দার চারে
মুখ ঠেকালো না চুনোপুঁটির দল...মুখ টিপে চলে গেল
।ওপাড়ে বসে থাকা সুস্বাদু গন্ধের টানে । আমরাও মুখ লুকিয়ে
ফিরে এলাম ... ক'দিন
বৃষ্টিতেই গংগার জল কিছুটা বেড়েছে ।খেয়াঘাট উঁচু হয়ে ।বাঁশের পিছল মাচা ।মাঝ নদীতে সবুজ দ্বীপ জেগে ।কখনো যাওয়া হয় নি ঐ উলুখড় ঘেরা প্রান্তরে ।এবার হেমন্তে যাওয়া যাবে একদিন ।শীত
এলে সাইবেরিয়ান গ্রিজের হাট সেখানে ।মাঝ গংগায় নৌকা...নিচে অথৈ জল।শুধু
আমি কিনারায়... ৫ সেকেণ্ডের ব্যবধানে ।কোনো মানুষের আত্মগত উপলব্ধিতে যদি কখনও এই বোধ বাসা বাঁধে
যে , সে অপদার্থ ,
প্রয়োজনহীন , অতিরিক্ত , অন্যের
করুণার পাত্র ।তখন সেই আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ক্ষণজন্মা মানুষটিকে ধরে রাখা কঠিন ।চলে
যাওয়া মানুষের কথা বেশী করে মনে পড়ে ।দিদিমা প্রায়ই আমার এক মামার কথা বলতেন।অরুণ মামা ।যিনি প্রায় অবিকল আমার মতোই
ছিলেন । আমি তাঁর ছবি দেখেছিলাম ।অবিকল এক....
তারপর যেতে যেতে.. এক নেড়া অশ্বত্থের
তলায় বুড়োশিব গত ফাল্গুন থেকে একা বসে । রোদ বৃষ্টিতে খড়মাটি
বেরিয়ে পড়েছে ।ভ্রূক্ষেপহীন পথচারীর দৃষ্টিতে আমি
নেই ...শুধু অবয়ব হীন খড়দেহে শূন্য বাতাস খেলা করে .... নৌকা থেকে নেমে কাদাজল ভেঙে গুরুপূর্ণিমার
দিন গোঁসাইয়ের আশ্রমে যখন
পৌঁছালাম তখন প্রায় বিকেল শেষ ..তখনো অন্নসেবা
চলছে ।আমি পীড়াপিড়ি এড়িয়ে
গানের আসরে গিয়ে বসি । অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে
পড়ছে বিজয় সরকারের সুর ।
পোষা পাখি যাবে উড়ে সজনী , একদিন ভাবি নাই মনে ...গৌর
গোঁসাই বাবাজীর আশ্রমে ৩দিন মহোৎসবে বিগত কয়েক বছর হল আমার যাতায়াত
। যদিও আমি তাঁর দীক্ষিত নই ।এ ক'দিন শুধু তত্ত্বকথা ,সন্ধ্যায় বাউল আর মহৎসবে কয়েক হাজার ভক্তের সমাবেশ।বহিরাগতদের অধিকাংশই
পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন
প্রান্ত থেকে এসেছেন ।শুনলাম ভারতবর্ষের বাইরেও
পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে
তাঁর অগনিত ভক্ত ।আমি সাধন ভজনের লোক নই
।নাস্তিক মানুষ । তবু ২/৪ দিন অপার আনন্দ আর শান্তিতে কাটে ।যেখান থেকে
সহস্র যোজন দূরে ফেসবুক ,
মোবাইল আর ইন্টারনেট
।
৩/৪ ক্রোশ সাইকেল
ঠেঙিয়ে যাওয়াটাই অকারণ হল ।কাজ হল না।সকালটাই মাটি
।আকাশে মেঘ ছিল।গুঁড়ি
গুঁড়ি বৃষ্টি।চষাভুঁই আর মাঝে মাঝে কাশবনের মধ্যে
দিয়ে রাস্তায়
কুড়িয়ে পেলাম ক’টি লাইন _এ আমার কোন কাজে লাগবে !ক’বছর কবিতার ভূত ছিল না ভাল ছিলাম । পথে বেরিয়ে পড়েছিল গান পাগল মৃত্যুঞ্জয়।এক কালের বাউল শিল্পী।সুরের মুর্চ্ছনায় আমাদের স্তব্ধ
করেছিল
অনেক সময় ধরে।বিনিময়ে তার কোন প্রত্যাশাই নেই ।মৃত্যুঞ্জয়ের
গান শুনে
দাঁড়িয়ে গেল আরেক সদ্য-পাগল পল্টু।সেও
দমে যাবার পাত্র নয় ,অতএব শুরু হল
গানের লড়াই .....ভালবাসি গ্রাম্যমানুষ ,তাদের
জীবন যাপন।একজন
রিক্সাওয়ালা থেকে আই.এ.এস অফিসার সকলেই আমার বন্ধু তালিকায়
আছেন (ফেসবুকে
নয়) ।ইঁটে মাথা রেখে রাত কাটানোর
অভিজ্ঞতাও যেমন আছে তেমনি থ্রি স্টার হোটেলেও কোনদিন অভূক্তও ।হত দরিদ্রের । এটাই জীবন । আমার বৈচিত্র্যময় জীবনযাপন
......অন্ধ আর খঞ্জদের হাত ধরাধরি করে ভাঙা সাঁকো বরাবর কি নিদারুণ সখ্যতা ।পাকা সাঁতারুরা এসবের তোয়াক্কায় না থেকে সাঁকো টপকে ফাঁকা মেলায় একদঙ্গল পাগল ছাগলের দলে হারাধনের ছেলে নীলমনিকে খুঁজে বেড়ায় ... আমি কিন্তু কাউকে বলি
না,নীলমনিকে আমি চিনি । আমার মতোই সে...রোগা ভোগা ।জিভে তার অসম্ভব কামড় ..ঘরের এককোণে যখন চুপ শুয়ে থাকে জড়োসড়ো ।কানের পাশদিয়ে জেট গতির কামড় ।টিকটিকির বিষ্ঠায় নিউটন হলে,পায়ের তলায় সুড়সুড় ডুবে যায় ।আর ব্যাঙের পা ছুটে আসে ...অপাংক্তেয় নিজেরাই পংক্তিবদ্ধতায় সচেষ্ট হাস্যকর ভাবে ।তা হোক ।
কিছুই কিন্তু হচ্ছে না বাপু।দলবাজি আর কাদালেপা ছাড়া ।
গঙ্গার তীরবর্তী বর্ধমানের একটি অখ্যাত গ্রামে কাল সন্ধ্যায় কুয়াশা আর সাইকেল ঠেলে ঠেলে যখন পৌঁছালাম, গঙ্গার ভাঙ্গনে নিশ্চিহ্ন প্রায় অঞ্চলটির গৃহহীন
মানুষ গুলো শোক ভুলে মেতে উঠেছে রাস উৎসবে। মেলার এককোণে বসেছে কবিগানের
আসর ।তপন ও রাঘব কবিয়ালের গানের লড়াই । পালা 'কৃষ্ণ
শকুনি '। পরিচিত এক গোঁসাই কাছে ডেকে নিলেন । মুগ্ধ হয়ে বসে রইলাম । সারারাত জাগার পর সকালে টাটকা খেজুরের রসের আস্বাদে মন ভরে গেল..... গঙ্গার পাড় ঘেঁষে রাস্তা । শ্মশানে
চিতার কুন্ডলী ঘিরে শোকাতুর মানুষের ভীড় ।কিছু দিন আগে
এখানে আমিও ছিলাম বন্ধুর মায়ের শেষযাত্রায় ।আরো কয়েক
বছর আগে,মা।তারপর বাবা কে নিয়ে ।চোখ বাস্পে ভরে যায় ।নৌকা এগিয়ে চলে । পাশাপাশি ছোটো ছোটো মাছ গুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ।বিকেলের
পড়ন্ত আলোয় রুপোর
মতো চকচক করে ওঠে ...আগুন পোয়ানো টা খুব বাজে নেশা। ক বছর হলো এই
নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে।প্রত্যন্ত গ্রামে গেলেই ছেলেপিলেদের
সঙ্গে
বসে যাই ।ওরাও জানে আমার নেশার কথা । কাল রাতে এ বছরের
প্রথম আগুন পোয়ালাম ।দারুণ আমেজ । কাকভোরে তারাই জোগাড় করে
আনে হাড় কনকনে ঠাণ্ডা খেজুরের রস । তারপর আবার আগুন পোহানো । অক্টোপাশের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসতে একটি কিডনীর বিনিময়
খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ।সাময়িক শ্বাস
নেওয়ার তাগিদে ... নচেৎ হিমশীতল স্পর্শই অবধারিত । তেঁতুলপাতার জড়াজড়ি।৫ জন।শ্বাসবন্ধ
করে।পদধ্বনির অপেক্ষায় ।এ +।সুজন কেউ ... হৃদয়বান।সেই যে ৬০ হাজার কাঞ্চনফুল ফাঁস
হয়ে অপেক্ষার... অপেক্ষায় ... ইতি শেষ চিঠি.. অংকের খাতা ছিঁড়ে আয়ুফল নামে ... পেরিকার্ডিয়াম তার কিছুই বোঝে না ।সংখ্যা তত্তের ভুল ... শুধু
অলিন্দের ঘুম এঁটে আসে চশমায় ...অক্টোপাশের
মাঝখানে আয়না রেখে আসা বহুদিন ... মাঝেমাঝে নেড়া মাথা হয়ে উঁকি
দিই তাতে ।চুমুর উষ্ণতা এই ১০ ডিগ্রীতেও প্রখর।পোড়া-কাঠ হয়ে আছি ...পালাবো ভাবি ... পারি কই ! তাই ডুব মারি । কবিতা থেকে । আমার অসুখ নেই আর ।তাই হয় ! ভাল থাকা আর হলো না ... আমি ,শ্যামা আর রাজকুমার
দা ... সব ইতিহাস
মেশামিশি হলে রাজকুমার দা তাই বলে ওঠেন ৩ টে খারাপমানুষ একসঙ্গে
থাকা ঠিক নয়।রাজকুমার দার প্রিয় মানুষ কিষাণজী ।যাকে ,প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর কার্য্যতঃ হত্যা করা হয়।কাটোয়া বইমেলায় ঘটা করে
রাজকুমার দা কে সম্বর্ধনা দেওয়ায় বেজায় বিব্রত তিনি
।সাম্মানিক টাই যা কাজে লাগলো _তাঁর ভাষায় । অবাক হয়ে
শুনি
তিনি যখন গল্প করেন তাঁর এক পুলিশ অফিসর বন্ধু এক অভূক্ত ভিখারিনীকে নিজের বাসায় এনে , আহার করিয়ে ,মাতৃ-জ্ঞানে
প্রণাম করে তার হাতে তুলে দেন একটি ৫০০টাকার নোট ।এমন পুলিশও
আছেন এই বাঙলায় !ভাবুন ,কতো কিছুই
অজানা রয়ে যায় এরকম...কদিন আগে বর্ধমানের এক গণ্ডগ্রামে রাত
কাটছিল।কাঠের
তক্তায় শুয়ে।পায়ের
কাছে কাঠের তাঁতের গাছবোয়া নেমেছে টিনের ছাদ থেকে ।টাঙ্গাইলের
নকসা নিয়ে ।যার সংকেতে কম্পিউটর থেকে প্রিন্ট আউট বের হয় আজকাল ।গাছবোয়া নামে সুতোয় সুতোয় ধান ফোঁটা,
মাকুর কারুকাজে ..ফুলে ওঠে আঙুলের ঘাম ।পান্তা ফুরানো থালায় নুনের বৃষ্টি...নাম লেখা পাঁচটি শামুকের।পাটকাঠির দেয়াল ভেদকরা ঠাণ্ডা ।পাতলা কাঁথায় বাগ মানানো যাচ্ছে না।আর মাঝমাঝেই চৌকির নিচে শুয়ে থাকা দুটো তাগড়াই চেহারার ছাগলের শিংয়ের গুঁতোয় দুলে উঠছি চৌকি সমেত। এরমাঝেই ফোনে অরুণের কবিতা শুনছিলাম ।আমি
চট করে
কারো প্রশংসা করি না , তাঁর কবিতায় মৌলিকত্ব বা
উল্লেখযোগ্য না হলে ।
শঙ্কর সেনের আশ্রমে ৫দিন
ব্যাপী উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বসেছিল কবিগানের আসর ।গঙ্গার পাড়েই ম্যারাপ বাঁধা ।মাঝেমাঝেই প্রকাণ্ড সব ট্রলারের ভোঁ...প্যাণ্ডেলের একপাশে
বাঁশবন ঘেঁষে বাতিস্তম্ভের লাল-নীল সংকেত ... অন্ধকার চিরে ফ্লুরোসেন্টে
_বিশু কবিয়ালের রাবণ সেজে আত্মপক্ষ সমর্থন ও স্বর্গের সিঁড়ি বানানোর প্রতিশ্রুতি ঝরে পড়ছিল ।মর্তের মাটিতে , মানুষের মতো ... সারা
রাত শুধু গানের আসরে জেগে থাকা আর মাঝেমাঝে তন্দ্রা কাটানোর চেষ্টায়
কখন ভোর হয়ে আসে । গোঁসাই বাবাজীরা তখনো ক্লান্তিহীন।সাগরিকা
তখনো
গেয়ে চলেছে -নিমাই দাঁড়ারে ,দেখিব তোমারে নিমাই ..দাঁড়ারে এ এ ..
পরেশ আশ্রমের কাছেই থাকে ।আমার পরিচিত
।গৌর গোঁসাইয়ের প্রিয় ভক্ত । দুপুরে আমার বিশ্রামের ব্যবস্থা হল
তার সাধনকক্ষে । একটি নির্জন বাগানের মধ্যে আম জাম কাঁঠালের
ছায়ায় ঘেরা একচালা ঘর .. বড়ো বড়ো ঘাসের মাঝখান দিয়ে রাস্তাটি
শেষ হয় সেখানে । মাটির দাওয়ায় খেজুরপাতার পাটি বিছিয়ে দেয় পরেশ।এরমধ্যেই
টুপটাপ করে বৃষ্টি শুরু হয় । পাতার ওপর বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে
কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি...কোন বৃত্তেই বাঁধা নেই ,তাই
বৃত্তের বাইরে থেকে _
অন্তর্গত বিন্দুর ক্ষয়াটে , অস্পষ্ট
রোগগ্রস্থ চেহারাটা খুব সহজেই নজরে আসে। আর অন্তঃসারশূণ্য আস্ফালন ।দেখে আয়নার হাসাহাসি মুখ টিপে থাকে। বেনুবন.. মুক্তো-সন্ধানী ।কানা বলরাম,তবে ঘুরপথ পেলে - বলির জংগলে! মাটির প্রদীপ ঘোরাই .. আর চোখে আঁটোসাঁটো কলুর বলদ ।অজস্র রেখায় ...পা বাড়িয়েছি তিন প্রহরেই আড়ালে দেখছে মা .. বাঘের উপুড়
দৃশ্যে মেয়ে _রাজদণ্ড কানামাছি ভোলানোর ছল .. হামাগুড়ি । আকাশের
বিনোদবিহারী কাটাকুটি হয় । মেয়ের রেপ-সিন,উইংসের
আড়ালের অভিনয় যেন সত্যি ভাবছে মা ...বাঁশের খুঁটিতে গড়িয়ে চোখের জল..
স্কুল-জীবনের একজন বন্ধুই এখনও নিয়মিত
যোগাযোগ রাখে ।পাশে থাকে সুখ ও দুঃখের দিনে ।এমন বন্ধু
অনেক ভাগ্যে মেলে । সারাজীবনে এরকম দুজন মানুষের সন্ধান পেয়েছি যাঁরা একটি শব্দের সার্থকতা ,
গর্ব।আর আমি অহংকারী হয়ে রই ।
খুঁজে বেড়াই আরো
সন্ধানী হয়ে .. আরো একটি মানুষ... কোথায় পাই... কোন খানে !
শুধু বেণুবন ঘন
হয়ে আসে আর মুক্তো-সন্ধানীর চোখ এঁটে ডুব দিয়ে থাকি । আজীবন।দরজা পকেটে
নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানোর জো আছে ! গবাক্ষেও
নিশিকুটুম্বের উঁকিঝুঁকি
.. কক্ষপথ গোবরের আস্তানায় রেখে,জোনাকির খোঁজে কচি
সাজার ইচ্ছেয় বাদ সাধা আর কি ? আলোর অরুণ তবু উজ্জ্বলই থেকে যায় ...বট-অশ্বত্থও আজকাল কলমি লতা
, স্বর্ণলতায় নির্ভর হয়ে উঠছে .. বুড়ো বট জানে তার ঝুরি নামানো শেষ ।কাছিমের মতো খোলা উল্টে গেলেই _
সর্বনাশ ।বাদুড়ের ভালবাসা শুষে _ নাম
, কালো অক্ষর
শুধু .. কলমী সবুজ আর সোনালী আভায় জ্বল জ্বলে হয়ে থাকার
প্রয়াস এখন
।বুড়োশিবের শক্ত আশ্রয় পেয়ে লতাপাতার দলও ফন্ ফন্ করে উঠছে ।তাদের পতাকায় অরণ্যদেবের চিহ্ন ।ধারে কাছে কাকপক্ষীও নেই । শুধু ফাঁপা কুয়োর ভেতর থেকে ব্যাঙের গলায় খাম্বাজ .. সমুদ্র ভরে নেয় স্বপ্নে ।আস্তরণ খসতেই .. দেখো , ভেতরের
বস্তুটি কিন্তু নিঁখুত ।কাঁটায় কাঁটায় । একচুল এদিক ওদিক হবার
জো নেই ।আসলে নুনের গুণ তো আছেই । জল পানির প্রকারান্তে ।কাদা মাটি পুড়লেও কালো কালো ভীমরুল ,
লেখায় মারাত্ত্বক শেল । মাঝেমাঝে বর্মের সেলটারে মজাটা উপভোগ্য ।দাড়ি টাড়ি মুখে জড়িয়ে খানখান অবস্থা কবির .. তারপর চেনা গেল ইনিই ন্যাতা মিঞা ।আমাদের বেড়ার ওপাশে ঘর ।সেই যে ৭০/৭১ এ মুখ পুড়িয়েছে নশকাল পিরিওডে।
তবু নজজা নেই গা ! আমরা কতো মলোন নেগিয়ে দিই ছিনু , তাতেই
চিকনাই
চিহারা আজ । খুব ক্লান্ত
আর বিরক্ত
লাগে যখন দেখি _ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে গতিহীন , অবয়বহীনদের
চীৎকার
চেঁচামেচিতে অন্যদের স্থিতিজাড্যে রূপান্তর এবং অবয়বহীন
গতির স্বপ্নে বিভোর
_ ঘেরাটোপে সলিল সমাধি ।বস্তুতঃ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে হাত-পা ছোঁড়া ছাড়া কিছুই
না।এক কদমও না।সহস্র অবয়বহীন মুখের একই আদল।পথের ধারে ধুলোমাখা দুই দেবশিশু আপনমনে খেলায় ।মায়াময় চোখের জাদুতে দাঁড়িয়ে গেলাম ।বড়টার বয়স ৩/৪।
ছোটোটার বড়জোর ২ ।নতুন জায়গা।আসেপাশে কেউ নেই দেখে খুব লোভ হল ।পায়ে পায়ে এগিয়ে
ছোটোটাকে কোলে তুলে নিলাম । স্বভাবতই বিরক্ত সে , খেলায়
বিঘ্ন ঘটায় ।সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে নিই ফাঁকা রাস্তা । ওর ফর্সা গালে গাল ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞাসা করি , তোর নাম কি রে ? অনেকক্ষণ
সে চুপ করে
থেকে আধো আধো সুরেলা গলায় বলে 'আববাছ
মিআ '। আমি হো হো করে হেসে উঠি ।এবার তার
কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে ভয় পেয়ে যাই ।সাইকেলে উঠে পড়ি ।কেননা , লোকজন
জুটে গেলে
এ অবস্থায় আমাকে দেখে , পাগল অথবা ছেলেধরা ভেবে
দু/চার ঘা চাপিয়ে দেওয়া আশ্চর্য কিছু নয় ।অশ্বথপাতায় লেখা মনসার
নাম । সারি সারি প্রণাম ঘুমোয় হাঁড়িকাঠে .. জল ও জঙ্গল সাক্ষী
তার ।ধাগা বাঁধবার হাতে চোলাইয়ের স্নান , পায়ের
কাজকাজে । ভাসানের রাতে গলুইয়ের টান... কাল সারাদিন কাটল নতুন
জায়গায় .. অদ্ভূত অভিজ্ঞতায়।ভরা গঙ্গার ধার ঘেঁষে মনসার
থানের এক
অশ্বত্থ গাছে , সুতো বাঁধা .. অসংখ্য মূর্তি
ঘিরে বিশ্বাসী মানুষের ভিড়ে আমিই একা অবিশ্বাসী ।আর রাত
কেঁপে উঠেছিল নেশাগ্রস্থ পায়ে .. সবুজ ঘাসে ।পাখির মতো উড়ে বেড়ায়
যে আরশোলা ,
তার আছে আকাশ ভরা ফানুস।সবুজ..হলুদ..বেগুনী।মাঝে মাঝেই সে ফুঁ দিয়ে দুলিয়ে দেয় গ্রহমণ্ডলী ।এটা তার ধারণা
।আসলে সে নিজেই টলমল করে । পাখনার ঝাপটায় ।তার পুঞ্জাক্ষিতে তখন হাজার হাজার উদ্যত বুড়ো আঙুলের মিছিল।আরশোলা সমাজে টেলি
যোগাযোগ বড়ই উন্নত।
5G পরিষেবা।দুঃখ নয় । শুধুই কৌতুক আর হাসি বিনিময় ।বকের শাদা ডানাও ঢেকে
দেয় তেলচিটে রঙে ।শাদা পালক গুলোর তখন কাদাজলে মুখ গুঁজে আত্মহনন । আকাশেরও
থাকে জলভরা মেঘ .. বন্যার মত নেমে আসে অঝোরে । আর কাদামাটি মিশে থাকা উভচরের দল জিভ বার করে হেসে নেয় খুব । মহাভোজের অপেক্ষায় ...আগেও দেখেছি ,
এখনো দেখছি _ প্রচার সর্বস্য আর প্রচার বিমুখদের ।একশ্রেণীর আছে প্রভাব, প্রতিপত্তি
আর মেকী অহংকারী সিণ্ডিকেট ।...কবিতা নেই একটি লাইনও ।আবরণ
আস্তরণ খসতে যা দেরী ।দ্বিতীয় শ্রেণীরাই প্রথম শ্রেণীর যাত্রী প্রকৃতপক্ষে।ব্রাত্য মনে করেন প্রচার সর্বস্যদের।অস্পৃশ্যের মতো
নিজেকে
বাঁচিয়ে রাখেন।আগামী প্রজন্মের।....
বৃষ্টি থামলে উঁচু বাঁধ পেরিয়ে
গ্রামটিতে ঢুকে হকচকিয়ে যাই ।আমায় ঘিরে ধরল তেত্রিশ দেবতা
আর টি.ভি সিরিয়ালের নায়ক নায়িকার ক্ষুদ্র সংস্করণ । দুগ্গা লক্ষী সরস্বতী কার্তিক বাহা কাজল বিবি ভাদু টুসু। নাম জিগ্গেস করতে গড়গড়িয়ে
বলে গেল ।
বুঝলাম এরা লাইভ শো র কুশীলব ।আজ
যে ঝুলন পূর্ণিমা
। সঞ্জয়ের বাড়ি পৌঁছে দেখি ওর ছেলেমেয়েরাও
টুলস্ বক্স নিয়ে মায়ে কাছে বসে । আমাকে দেখেই ছেলেটা হৈ
হৈ করে উঠল 'ধুতিটা ভালো করে পরিয়ে দাও তো জেঠু , মা কিচ্ছু পারে না । মেয়েটা জিজ্ঞাসা করি - তুই কি হবি ? সে ফোকলা মুখে ফিক্ করে হেসে
বলে, আমি তালী তাকুর .. ও তাত্তিক
।কাল বিকেল থেকেই আকাশে মেঘ ঘোর করেছিল । ঝিরঝিরে হাওয়ায়
আমার গন্তব্য- নদীর ধার বরাবর সরু এক ফালি পথ ধরে ছোট্ট একটি গ্রাম। কখনো সখনো প্যাচপ্যাচে কাদা আর জল ।তবু এটাই শর্টকার্ট । যেতে যেতে ফাঁকা এক সবুজ ঘাসের প্রান্তর । লোভে পড়ে উঁচু এক ঢিবির ওপর বসে পড়ি । গঙ্গার মাঝে জেগে ওঠা চর । পিছনে ধোঁয়াটে বৃষ্টি আর জলের শব্দে নেশা লেগে গেলো ।তৎসহ
ধূমপানের ।কয়েক ক্রোশের মধ্যে জনবসতি হীন নির্জন এলাকা । আর পশ্চিমের মেঘে আলোর ক্ষীণ রশ্মি নেমে আসছে ।সম্বিত ফেরে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটায় । আশ্রয় বলতে জোটে কাছের বাঁশবন ।কাল ছিল শনিবার ।অমাবশ্যার উল্টো পিঠ ।মাঝরাতে বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ধকার বাঁশবন , গংগার
ধারে একা
একা ঘুরে বেড়ালাম
রাত ১টা নাগাদ । কিন্তু কারোই দেখা পেলাম না।ভূত কিম্বা ভগবান ... নিজের জীবনে প্রতি ভালবাসা আমার কোনকালেই ছিল না , এখনো নেই।তাই ভয় পাবার প্রয়োজন মনে করিনি । চাঁদনী রাত আর কুয়াশা
ঠেলে আমি আর আমার সাইকেল। মনে
পড়ছিল বাবু ভাইয়ের লালমণিরহাট ,
সিলেটের অলৌকিক ঘটনা গুলো ।
আজও ভগবান বা ভূত কারও দেখাই
মিলল না ।
মেয়েটির
সাথে কয়েক মাস পর দেখা ।ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে মাটিতেই বসে পড়লো ।আজ কিছুতেই ছাড়বো না তোমাকে , থাকতেই হবে । নিরুপায় হয়ে সম্মতি দেবার
পর ঘুপচি ঘরের থেকে বের
করে আনলো _ পোড়ামাটির রঙচঙে গরু ,ঘোড়া ।আর একটি মাটির যাঁতাকল ।বলল ,
কাল কমলনগরের পীর সাহেবের
মেলা থেকে ঠাম্মা কিনে দিয়েছে
। মনে পড়ল এই পাঁচ বছরের মেয়েটির মতো ছোটোবেলায় আমারো একটা মাটির যাঁতাকল ছিল
। তারপর রঙচটে বিবর্ণ
হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে একসময়.... এক
যুগ আগে যখন মহারাষ্ট্রের পথে পথে ঘুরে বেড়াতাম আকোলা জেলার এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ।মহান , করতখেড় , দুধসর , পারস
... কবিতার ক ছিল সহস্র যোজনে ।দুয়োরাণী করে ।লিখতাম না । ইচ্ছেও করতো না ।তার কাছে আমাকে কোনোদিনও নতজানু হতে হয় নি ,
বরং সে ই । এখনো
।তবুও তখন , চারপাশের মারাঠী ,
হিন্দী ভাষাভাষী মানুষের
ভিড়ে ব্যাকুল হয়ে উঠতাম আ-মারাঠী মাতৃভাষায়
কথা বলার জন্যে । অরুণের ট্রেন ২/৩ ঘণ্টা লেট
।স্টেশনে এক পাগলের পাল্লায় পরলাম ইচ্ছে করেই । আমি
তো আর হতে পারলাম না... এই আক্ষেপে । সে আমাকে স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ শেখালো ,মাতৃকুল,দেহতত্ত্ব ...আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম - মনোযোগী ছাত্র হয়ে ।
বিল্বগ্রামে এসেছি । সুপ্রাচীন গ্রাম
।পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জন্মস্থান ।ঈশ্বরচন্দ্র পায়ে
হেঁটেই কলকাতা থেকে আসতেন তাঁর বাড়ী । বিল্বগ্রামেই প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষের জন্ম ভিটা রয়েছে। সেই সুবাদে তাঁর সাথে এই
গ্রামের এক নিবিড় যোগাযোগ ছিল ।এই গ্রামেই কয়েক বছর আগ তাঁকে খুব কাছ থেকে
দেখেছিলাম বন্ধুর বাড়ীর এক ঘরোয়া পরিবেশে ।অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ।চারিদিকে প্লাবন ।জোৎস্না আর দারুণ হাওয়ার ।বারান্দায়
মাদুর পেতে আছি ।শুধু নারকেল আর কলাপাতার শব্দ , চাঁদটিকে
গাছের ফাঁকে বন্দী করতে চেষ্টা করতে করতে পায়ের কাছ দিয়ে সড় সড় করে কিছু একটা ফিরে
গেছে
শুধু আক্ষেপ এই পূর্ণিমায় ভিজে যাওয়া নাকাশীপাড়ার
সিংহরায় বাড়ীটি দেখা হল না ।পরদিন কচিকাঁচাদের দলে ভিড়ে
গেলাম আমরা দুই চালসে বুড়ো । ৭ থেকে ১৪
হয়ে ।কলার
মাড়ে ঝাঁপানো , পুকুরের ঠান্ডা পাঁক মাথায়
চাপিয়ে ঘন্টা ভর হলুদ হিমসাগরের টুপটাপ সাঁতার কুড়িয়ে নেওয়া
ছেলেবেলা ভেসে উঠল ।টুকটুকের সবুজ চশমায় জলের ভেতর
সবুজ জল আর মাটি ।মাছের ঠোক্কর খুঁজে পাওয়া গেল না ।
জল । হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে যখন ~ ঘূর্ণীতে
তাকিয়ে স্তব্ধ ছাড়া উপায় _অভিধান
লেখে নি । বাকি এরকম হলে ভালই হতো ।তবুও প্রশংসা দণ্ডবৎ হয়
।আপদমস্তক
পানা-পাথরের শিরস্ত্রাণ । সবুজ
দস্তানা ।চেনা হুঙ্কার , পাথর আগলায় কবন্ধ হয়ে ।কুয়োও আজ সমুদ্র খেয়ে আবীরের
স্বপ্নে মশগুল ।চেনা গান
স্বরলিপি ভেঙে ছত্রকার ... ২৫ পংক্তির ।সার সার
নিরোর-বেহালা ~
এসো আগুন চেনাই ... অথবা
কালাশনিকভ .. সারাদিন মেসিনের কালি সারাতে সারাতে কখন বামনের
হাত - চাঁদের সন্ধানে বের হয় ।আকাশ ভর্তি ছোটাছুটি ,খোঁজ ।তেলকালি মাখা নোনা হাত
ছোটো হয় চাঁদে z পুকুরের
ফাঁদে আটকে। শুধু আকাশ কুসুমের রেণু ঝরে ঝরে পড়ে... বনসাই পুকুর ছুঁয়েছে বলে –
ওপরের চাঁদ হেসে ওঠে z আরো
একবার উপলদ্ধিতে এলো মৃত্যুর নির্মমতা ।তারচেয়েও বেশী নির্মম আমাদের হিন্দু ধর্মের সংস্কার এবং পারলৌকিক রীতিনীতি ।চোখের সামনে দেখতে হলো সদ্য পিতৃহীন ৮ বছরের অবোধ বালক কে সন্ধ্যে
৬টার সময় এই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়
মাথা চেপে ধরে জোর স্নান করানো হল গংগার
হিমশীতল জলে ।তখন সে চিৎকার
কাঁদছে ... আমার একক প্রতিবাদও সম্মিলিত কলরবে
ক্ষীণ হয়ে যায় .. দূর থেকে গাজনের রোশনাই ভাসছে ।আমি আর কাছে যাই না । উৎসবের
শোকপালনে
।তবুও কদম আকাশে ওড়ে ।সোরা ও গন্ধকের পথ ঘাট ।আমি ঠিক অন্ধকার চিনে রাখি ।পিকাই মাটির পুতুলে চোখ ডুবিয়ে আকাশ ওড়ায় ।আমার
বোতামের খসে পড়া _ক্লান্ত
হয়ে ।পুরোনোর মতো নতুন বৈশাখ ... আনকোরার সমার্থে ।কালো পিছন লাফিয়ে উঠতে চাইছে ... চতুস্পদটি বোঝে না বরফের এক টুকরো তাকে হিমায়িত করতে না পারলেও আগুনের এক টুকরোই যথেষ্ট । তবু শীতের দোস্ত নেই
।আগুন ছাড়া ।গলি ঘুঁজি ছেড়ে রাজপথও হাঁটছে বৃদ্ধাশ্রমে ।শিশুর কান্নার মাপ নেওয়া শুরু ।শুধু লেবেনচুস ধরিয়ে দেবার অপেক্ষা ...
ফাল্গুনে সবে মুকুল এসেছে ।ঐ নামেই ডাক
নাম আমার ।মায়ের কাছে শুনেছিলাম ১৬ই ফাল্গুন ।নামটি দাদুর দেওয়া
।আমাকে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়েছিল ।৬ মাস বয়স কম
থাকায় জন্ম তারিখ বদলে ৮ই জুন । অফিসিয়ালি সেটাই সবাই জানে ।গতকাল ছিল সেই দিন ।আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে যতোদিন বাবা মা বেঁচে থাকেন একজন বয়স্ক মানুষের জন্ম তারিখ ততোদিনই মনে থাকে পরিবারের লোকজনের ।ঐ পায়েস টুকু পর্যন্ত ।একসময় সেটাও ভুলে যায় সবাই ।কাল সারাদিন কেটেছে একটি প্রিন্টার নিয়ে ।তেলকালি মুছে বাড়ি ফিরে কলাইয়ের ডাল,আলুপোস্ত আর ডিম ভাজা ।পিকাইয়ের মা জানতেও পারল না এটাই আমার
জন্মদিন ।
রগ ওঠা হাতে ফুলে ওঠে আশীর্বাদ...মাটিতে পায়েসের গন্ধ ,দুব্বো
ঘাসের
ছোঁয়াছুয়ি..
আমার এক ঠাকুমার ছিল বেড়ানোর নেশা। প্রায়ই তাঁর পিছু নিতাম আমি ।তাই আমাকে সভয়ে এড়িয়ে চলতেন উনি
।তবে আমিও ছাড়ার পাত্র ছিলাম না ।এই
লুকোচুরি
খেলায় প্রায়ই ধরা পড়ে যেতেন তাই।ঠাকুমার ছিল গঙ্গা স্নানের নেশা।মাসের বিশেষ বিশেষ তিথিতে একটা মাটির কলসী কাঁখে নিয়ে ভোরবেলায় রওনা দিতেন ।আমাদের গ্রাম থেকে ৬/৭ ক্রোশ হেঁটে গঙ্গার উদ্দেশ্যে ।পাড়ার অন্য মেয়ে বউদের নিয়ে। আমিও ওত পেতে থাকতাম ।
রাস্তায় .. আমাকে দেখেই বট্ঠাকমা চোখ পাকিয়ে উঠতো।যাচ্ছো চলো , আমি কিন্তু নিতে টিতে পারবো
না । অগত্যা আমি ঘাড় কাত করে হাঁটা শুরু করি । আসলে তখন গ্রামে , একটু
বেশী বয়স পর্যন্ত কোলে পিঠে চড়ার প্রচলন ছিল । আমারো সেই বদ্ অভ্যাস হয়েছিল । আর বট্ঠাকুমা আমাকে এড়িয়ে চলতেন সেই ভয়েই । জমির আলপথ ধরে গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা।
দুপাশে ছোলা, মুসুরী আর সর্ষের ক্ষেত ।
স্নান সেরে ফেরার পথে আমার হাত ভর্তি ছিল কচিকচি ফল সমেত ক'আঁটি
ছোলার শাকে । মূলতঃ এরই লোভে গঙ্গা-স্নানে আসা ।হাঁটতে হাঁটতে
সেগুলোর সদ্বব্যবহার করছি । খেয়ালই করিনি দুটো তাগড়াই চেহারার
কালো মোষ যমদূতের মতো নিঃশব্দে আমার পিছু নিয়েছে । বট্ঠাকমার
চীৎকারে পেছন ফিরে দেখি ।' শিগগির
ফেলে দে '... আমি সে কথায় কান না দিয়ে ছুটতে শুরু করি । পেছনে যমদূত নিয়ে .. শেষে ক্লান্ত , সবার
চেঁচামেচিতে
বিরক্ত হয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিই পাশের বাঁশতলায়। তারপর ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে কান্না
...ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখি ,
দুই যমদূতের মহানন্দের আত্মসাৎ ভঙ্গিমা ।আয়না লুকিয়ে রাখে
শিশুকাল আর বৃদ্ধাশ্রম বাকি সব ছাইভস্ম মাখা....মাঝে মাঝে অক্ষর হারিয়ে যায় চশমার ভুলে।সর্ষের মতো ফুল আবছা ।কবিতা খোঁজা অকারণ ।কবি হতে চাই না । কেন যে পাগল হলাম না !পাগল না হতে পারার
আক্ষেপ সারা জীবনেও যাবে না।চলতে চলতে কতো মানুষ জড়িয়ে যায় ।ক্রমাগত জামা পাল্টানোর
অভ্যাসে সওয়ারী
বদলে যায় শুধু।সাইকেল রিক্সা থেকে বলেরোয় ।
তবু আমাদের সওয়ারী বিহীন ভাঙ্গা সাইকেল পতপত করে ... কোথাও ঘেঁটুফুল ফুটেছে ... তার গন্ধে কোকিল বদলে যাচ্ছে
।শ্যাম যদু মধুর
চিৎকার ডিঙ্গে আমাদের টোল খোলা থাকে।শালিকের
প্রাণ যতটুকু ধরে ।আর রঙ বলতে কালোই । ঝাঁপের দেয়াল টপকে ভেতরের
উঁকিঝুঁকি।আনচান শুধু টুঁটি চেপে নিয়ে আসে ততোই।গেরস্থের আতপে মাছি আর
মাছি ... তাই আর আসবো কিনা জানা
নেই ।এবার ঘুমানোর পালাবদল । আমি তো নিজের ছায়াই চুরি করে
একটু একটু
জমিয়ে রাখছি।ছায়াহীনদের নই ।সাবধান সাঁতার খেলেও পাড় হারিয়ে পালতোলার দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ক্লান্ত ।আর আমার কলার ,
ছেঁড়া শার্ট থেকে এ্যান্টেনা ছুঁয়ে।কচুরি পানার ভিড়ে ।অরুণের অপেক্ষায় ।সেদিন শিখার ধোঁয়ায়
কাফন দেখবে কার মুখ ? খানিকটা আয়না তখন চলকে উঠবে ।আমি তো ঘুমের পুত্র । তখন
। ছায়াহীন...নিয়ে আছে ।জয় মা ভবানী ।এক চক্ষু উঠেই নেমে আসে । লালরঙ সাঁতারের
।ইনকিলাবী যতসব পাহারায় ... তুচ্ছ তুছ ।একেবারে কিনারে পৌঁছে,
ঘন গাছ-গাছালিতে ঘেরা সিমেন্টের চাতাল _আধশোয়া
কাত
হয়ে দেখছিল তার খোঁজে কেউ আসছে কি ! পিকাই।তার মা ।অথবা কাকা ! ফাঁক দিয়ে দূরের রাস্তায় অজস্র অচেনা যাতায়াত ।ওদের
মধ্যেই কেউ কি ছিল ?
এখানে ঘেরা সবুজের নিচে
ঠান্ডা হাওয়ার দুপুর।দোয়েলের শিস্ ..ফিঙে..বেনে বউ আর ঝরে পড়া আমের শব্দ।কিছুটা দূরেই শেষের সীমান্ত
।থেমে যাওয়া জীবনের সৎকার ভেসে আসছিল গংগায় ।ক'দিন
বৃষ্টিতেই গংগার জল কিছুটা বেড়েছে ।খেয়াঘাট উঁচু হয়ে ।বাঁশের পিছল মাচা ।মাঝ নদীতে সবুজ দ্বীপ জেগে।কখনো যাওয়া হয় নি ঐ উলুখড় ঘেরা প্রান্তরে।এবার হেমন্তে যাওয়া যাবে একদিন ।শীত এলে
সাইবেরিয়ান গ্রীজের হাট সেখানে ।মাঝ গংগায় নৌকা...নিচে অথৈ জল।শুধু আমি কিনারায়... ৫ সেকেণ্ডের ব্যবধানে ।ফেরার পথটা ছিল রুস্তমের বাগানের পাশেই ।দূরে মে দিবস । রুস্তম আর তার মেয়ের কর্মবিরতি নেই ।শ্রমিক আন্দোলন কি তার জানা নেই ।রুস্তমের
পীড়াপীড়িতে
দু পকেট ভর্তি হয়ে ওঠে কাঁচা
আমে।তার সহজ সরলতায় আপ্লুত হই ।মেয়ে সাকিনার মাথায় এক বোঝা পাটের
শাক । চাচা , ছাক খাইবা ? এতোবেলায় .. শঙ্কিত হয়ে উঠি .. তোর চাচি ,
ঝাঁটাপেটা দেবে । আমার
প্রিয় জিনিসই তার অপ্রিয় ।
আমার কথায় খিলখিল করে ওঠে সাকি । রুস্তমের আমাকে এগিয়ে দিতে এসে ফিসফিসে গলা । যানো দাদা ,
ছাকিনা মোর কুইরে পাওয়া বিটি
।ছাত বছ্ছোর এগু ছিতকালে মাটে পড়ে পেয়েলাম ভোর আতে । আমি আমি অবাক হই না
।গাঁ গঞ্জে এ ঘটনা প্রায়ই ।সাকিনা দূর থেকে ঘাড় কাত করে । ফির আইয়ো কিন্তুক
চাচা..
।চাকা ফিরে আসে ফিরে যায়
কে যেন ফেরে না...রাস্তা তবুও ফিতের মতোন ।ভাঁজ খুলে খুলে
দেখে যাওয়া ।মাপ শুধু পিছলে পাঁকাল ।যাত্রীর উৎকন্ঠায়
।স্প্রিং খুলে - ছড়িয়ে ছিটিয়ে...
তারপর যেতে যেতে.. এক নেড়া অশ্বত্থের
তলায় বুড়োশিব গত ফাল্গুন থেকে একা বসে । রোদ বৃষ্টিতে খড়মাটি
বেরিয়ে পড়েছে ।ভ্রূক্ষেপহীন পথচারীর দৃষ্টিতে আমি নেই ...শুধু অবয়ব হীন
খড়দেহে শূন্য বাতাস খেলা করে ....দুদিকের এই
গন্তব্যের মাঝে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান ।
৪ ঘন্টা কেটে গেল এই সিদ্ধান্তের।অজস্র নতুন কবিতার লাইন অবহেলায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিই চিতায় ।এই তবে শেষের
কবিতা ! আজ , ভয়হীন ঝোপ-জঙ্গলে খুঁজে বেড়িয়েছি উদ্যত ফণা ... যার চেরা
জিভের সামনে হাত কে বাড়িয়ে ~ নাও , আমাকে গ্রহণ করো ।তুমুল
হাওয়া আর ভাঙা ভাঙা গোল চাঁদ মাথায় নিয়ে নারকেল গাছ হয়ে আছি ।অনেক দূরের ওয়াম্বেসীদের মতো গম্ভীর ঢাকের সংকেত আধশোয়া সিমেন্টের চাতালে । নেশার মতোন এইসব ছেড়ে যাওয়া একদিন , এই রাত তখনো থাকবে... প্রতি
মুহূর্তের
কতটুকু পায় পৃথিবী ...! বৃষ্টিতে মিশে যাচ্ছে শিরীষ ফুল আর মাটির সোঁদা গন্ধ ।মাঝে মাঝেই ঝাঁপসায় হারিয়েছে কিছু মুখ ।মনে এলেও খুঁজে আসে না ।বিশ্বাস হয় না , তাঁদের
আর পাওয়া যাবে না কোনোদিন , কোনোখানেই ।কোনোদিন এই ঝাঁপসা বৃষ্টিই
আয়নায় চকচক করে উঠবে না
...শরতের মতো । তবু কোনোদিন কোনো খানে টুকরো কাঁচের ছবি হীরের ঝলক আনে।অনেকদিন পর শিউলীর গন্ধে ম ম করছে বাড়ী ।চোখেই পড়েনি এতোদিন , ভাঙা
ইঁটের পাঁজা ভেতর ,
ঝোপ জংলার আড়ালে তর তর করে বেড়ে ওঠা ..
বৈশাখী পূর্ণিমায় অনেক অনেক বছর আগে গন্তব্য ছিল বর্ধমানের জামালপুর । বুড়োরাজ তলায় এক সন্ধ্যায়।বাবা মার সাথে ছই
তোলা গরুর গাড়ীতে
।ফুটফুটে জোৎস্নায় ।তখন ক্লাস টু/থ্রির
ছাত্র বোধহয়।গরুর গাড়ীর দুলুনিতেও ঘুম আসছিল না । ছইয়ের ফাঁক দিয়ে ,
মাঝরাতেও এক এক দল মানুষ চলে
যাচ্ছে ।চাঁদের আলোয় চকচকে তাদের শূন্যে
উঁচিয়ে রাখা টাঙি বল্লম সড়কি
। গামছায় ঢাকা ধাতব অবয়ব (ওগুলো লং-শটার ) আর
হাতের দড়িতে
বিভিন্ন আকৃতির
ছাগলের পাল ।তাদের সম্মিলিত
চিৎকার মানুষের হুঙ্কারে চাপা পড়ে
।জয় বুড়োরাজ কী ।আর তাতেই ঘাবড়ে
আমাদের গরু দুটো ,
গাড়ি সমেত রাস্তা ছেড়ে সটান
খাদে।..পৃথিবীতে
এখনো কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে সচারচর মানুষের পা পড়ে না ।এই বাংলাতেও।সবুজ ঝোপ-ঝাড় ,
কালো গর্ত , আর নাম না জানা পাখির ঝাঁক
নিয়ে
উল্টে পড়ে আছে নীল আকাশ ।এমনই এক দৃশ্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম ক'দিন
আগে ।রাস্তা
ভুল করে ।মুগ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল ।গন্তব্যের কথা
ভুলে
।খেয়াঘাটে পৌঁছে চড়কগাছ চোখের সামনে -- মেসিনের গিয়ার হুইল বেয়ারিং সব খুলে তেলকালি মাখামাখি হাতে, হতভম্ব
হয়ে বসে আছে মাঝি ।তখনই সন্ধ্যে নামবে ।বিকল পারাপার।আমার
মাথার আকাশ ,পায়ে লুটোপুটি খেয়ে পড়ল ।আমাকে যেতেই হবে গো,
গানের বায়না নেওয়া আছে
।তালে দাঁড় বেয়ে চলো ।নৌকো ডুবলে আমার দোষ
নেই কো -- মাঝির সাফ জবাব।মেয়েদের রেখে , আমরা ৭ জন ভুটভুটিতে লাফ দিয়ে উঠি । দাঁড় বলতে কাঠের পাটাতন
।হাত দিয়ে টানা ।ওনামের মতো ।নিজে যে সাঁতার শিখিনি আমি জানি ।মাঝি জানে না
।৫জন মানুষ জল কেটে চলেছে ।মাঝে মাঝেই ঘুরে যাচ্ছে নৌকার মুখ । সামনে নয়,
পিছন পানে তড়তড়িয়ে চলেছে
স্রোতের টানে । এক আনাড়ির হাতে হাল । আমাদের হাল
আরো খারাপ । ঘাট ছেড়ে বেরিয়ে
গেল....চোখের সামনে । শেষে খড়বনে আঘাটায় এসে
নামি ।কাদাপায়ে । সুম্বু শ্যান ।নাম জিগ্গেস করলে এটাই বলে শম্ভু ।লাইট ডেকরেশনের কাজ করে ।মজুরি জানতে চাইলে বলে ,পাচছো ট্যাহা ওজ নাগবি।চারদিন কাজ করার পর বলে - দ্যাও , দুচো
ট্যেহা ।এ হেন শম্ভুর এখন
দেহ রক্ষী ২ টো তাগড়াই
সাইজের সারমেয় ।রাতে শম্ভু তাদের গলা জড়িয়ে নাক ডেকে
চলে ।তাদের আদর পেলে ,
শম্ভুর গাল সারমেয় যুগলের
জিহ্বার স্পর্শ পায় ।যাবো বললেই যাওয়া যায় কি ! খেয়া গেল আটকে গেল _মাঝগঙ্গার ট্রলারে ...অনেক কসরতের পর ওপারে পৌঁছে ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যেয় টর্চ জ্বালতেই হলো । চায়না-তাঁতের কারিগরের দল তখন বাড়িমুখো ।আমি যখন উল্ঠোদিকে ভাঙা সাইকেলে ।চেনা মানুষ-জন আর অবাক হয় না
।আসরে পৌঁছে দেখি -- গোপাল গোঁসাইয়ের
সাঙ্গপাঙ্গো নিয়ে
গৌর-চন্দ্রিকার কসরত ।খোলের আওয়াজই বেসুরো লাগছে কানে ।শুধু পচাই একমনে
শুনছে । দুম শব্দে চমকে দেখি ।পচা হাতে কাছে পেয়ে আর সামলাতে পারে নি । শুধু পাগল বলেই
তার ৭ খুন মাপ ।
অক্ষর আর দৃশ্যের বাইরে _ লক্ষণরেখায় বিজ্ঞান নেই ।জ্ঞান _ নারকোল
মালার
গলায় বিজ্ঞাপন শুধু , ঢাকনা উল্টে বেড়াল হচ্ছে ।
মাছের গন্ধে উৎকট বমি ।সাক্ষীর ধর্মে _ রুমালের
ম্যাজিক ... কে শোনে আর ! ডোবার ধারে বসে থাকতে থাকতে কখন যে পিছনের পা লাফ হয়ে
ওঠে ...জল শুধু আওয়াজ শোনে আর উড়ন্ত ছায়ায় মুখ টিপে রেখে একদিন কুয়ো হয়ে ওঠে । তবু লাফ - কসরত করে যায় ।নাগালে কবে
হাত আসে ,তাহলে তো গান থেমে যাবে জলসার... বালতি ডুবিয়ে থাকা ছাগলের পাল -- ফাতনা নড়লেই
রৈ রৈ শব্দ ফেলে দেয়।ভুস্ হয়ে গেলে আমাদের পা -- চোরাবালিও বোঝে না ।তাও ডালিম ঈথার হয় না ।কাকচক্ষু ভাসে।শৃগালের ল্যাজ , গর্ত
বুঁজিয়ে বিরহের ধ্যানে পাগল.. মাঝে মাঝেই ভুলে যাই , ভূত হয়ে ফিরে এসেছি
আমি ।তাই চারপাশের সবকিছুই কিম্ভূত আর বিদঘুটে লাগে!ওঁত পেতে রাখা ,খুঁজে
খুঁজে পথ ছেড়ে বন-বাদাড় হয়ে আছে।আমাদের
উঁকি ।
ফাঁকি দিয়ে জানালা , বুড়ো আঙুলের লজেন্স হয়ে থাকা
দ্যাখে ।ধর্মকথায় শিং উঁচিয়ে তাড়ায় , চকচক
করেছে মাথার ওপর
।শুধু স্রোত , শুয়ে থাকা নয় , ভাত মাখা নয় ... এটাই বোঝানো কঠিন বরফের
গলনাংকে লোহার বর্ম হয়ে ওঠা
ঘিলু , মাঝেমাঝে শিং মাছ হয় ।কাঁটায় বিঁধে কাঁটা হয়ে থাকা । পা ফসকালে .. চিৎপাতও
কোমরের মাপ বোঝে ।গোবরের
হেসে ওঠা আলকুশি হয় ।বাঘের ছাল পরলেও বিড়ালের ম্যাও যায় না ।কদমের নিচে ভাজা
মাছের নজরে পড়ে যায় । উদ্বায়ী
আর বায়বীয় সুবাসের কান্না ,
হাতে ঝোল ডুবিয়ে শিকনি টানায় । শুধু
ছাগলের পাল যোগচিহ্ন চিবিয়ে চিবিয়ে
মুড়ির স্বাদে ভুল করলেও ,
কাফনের ভুল হয় না মুচকি তে ।
কবে স্বপ্নে নেমে আসবে সাদা অ্যালব্রার্টস্
! কদিন পরই ধোয়া তুলসী ,
সারি সারি সেলফি পাঠাবে
ফেসিয়ালে । একদিন ভুল ছাপে ।বাঙালীর একমাত্র ভালবাসার বাদ্যযন্ত্রটি আপন-পর মানে না , ডান-বাম
মানে না সুযোগ পেলেই বেজে ওঠে
যন্ত্রীর হাতে ।ঢ্যাং কুড় কুড় করে ।পাশে কেউ না কেউ অবশ্যই
।কাই না না ।কাই না না । বেড়া টপকে বিস্তর দৌড়ঝাঁপের পর মিষ্টি আঙুরও টক লাগে ..
মনের দুঃখে নীলের
পাতনা মেখে ,আপনি মোড়ল সাজা আর পাত্তা
পায় না ।কলকে সাজিয়ে দেবারও কেউ নেই .. অজস্র প্রবাহের যে ধারাটি ছিল সবচেয়ে বেশী অপচ্ছন্দের এবং অপাংক্তেয় , তারাই
সবচেয়ে বেশী সক্রিয় এখন ।বাহুবলে ।যদিও ময়ূরপুচ্ছেও ঢাকা পড়ছে কিছুই ।আত্মপ্রসাদ আর পণ্ডশ্রম শুধু .. আদা আর কাঁচকলায় দারুণ মাখোমাখো ... রাঁধুনীর প্রশংসা পরমান্ন হয়ে উঠছে ছিঃ ছিক্কারে ।উইংসের পিছনে খুলে পড়ে আছে বাঘিনী আর সিংহের ছাল ।শুধু শেয়ালের ছোটোছোটো লেজের আপস ।তিন মাথায় আর একটির
যোগসাজস ।ব্যালেন্সের
পূজারীর দোষ অর্সে না । এখন শেষ দৃশ্যের কানাকানিতে
জল ঢালা হবে ।শুধু গরাদই
ফাঁকা পড়ে রইল ।কড়ি-কাঠ গুনে ।ছোটো ছোটো ভুলই _তাঁকে
চেনাতে সাহায্য করে ।আরো নিঁখুতভাবে।যা অজ্ঞাত থেকে যায় তাঁর নিজের কাছেও । অনেক কবি ও শিল্পী জন্ম নেন শ্রমজীবী মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে । সবার অগোচরে ।প্রচারের ইঁদুর দৌড়ের বাইরেও কেউ কেউ আছেন , মুগ্ধ
হতে হয় তাঁদের
সৃষ্টিতে ।এক নাম গোত্রহীন রঙ মিস্ত্রির গজল শুনে এ কথাই
মনে আসে বার
বার ।জীবন ঠিক লাটাইয়ের মত তাড়াতাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে ... সানাই এর আওয়াজ শুনে
ছোটোবেলা থেকে একটা দৃশ্যই ভেসে ওঠে ~ যেন বন্যহরিণী জালে আটকা পড়েছে
।জাল থেকে বেরিয়ে আসার তার আপ্রাণ চেষ্টা ।এ প্রান্ত
থেকে অন্য প্রান্তে ।বিভিন্ন উচ্চতায় ।দূরত্বে । তার নিস্পাপ , কাতর
আকুতি ।কুচি কুচি সবুজ পাতা আর বরফের টুকরোয়
ভর্তি পথ-ঘাট,বৃষ্টি থামার পর । ভাঙা কাচ আর টালির শোকে কাতর । আজ
সারাদিন ইট গেঁথেছি।জানালার বদলে ।
কমলাপুরেই কেটে গেল তিন দিন ।দুপুরে ফুরফুরে মাটির নিকোনো
দাওয়ায় বসে
কলাপাতায় গরম ভাত আর পাটশাকের ঝোল ।সঙ্গে কাঁচা টমেটো আর
লংকা বেটে সস্
জাতীয় কিছু ।এরা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ , লেবুর
পরিবর্তে এটাই প্রচলিত ।অসাধারণ একটি
মধ্যাহ্ন ভোজনের অভিজ্ঞতা ।আকাশ আর আশ্রয় দুটো ই ফুটো হয়ে গেছে ... সম্বল এই ভাঙা
ছাতা ।সেটাও উল্টে যাচ্ছে বারেবারে ... ।চশমা হারিয়ে ফেলে অক্ষর । তারাদের খোঁজ চোখ ফেটে ফুলঝুরি
।তবুও নিরুদ্দেশ আসে ।ক্যানেস্তারা শুধু নামের মিছিলে দাসখৎ লেখে...ছেঁড়া ব্যাগ,সেফটিপিনের কামড় খেয়ে পিকাইয়ের স্কুল। কোনোদিন
১/২ পেটে ।সর্বশিক্ষা চলছে।অন্তদয়
প্রকল্প।সব আছে ।ছেঁড়া ব্যাগ স্কুলে গেলে...তার বাঁকা-সেফটিপিনের আধখানা কামড়
জামিতিক কোণ ভুলে কাশফুল হয়ে ওঠে খাতায় ।পোড়া রুটির গন্ধে ক্লাস ছুটে আসে ।তফাতের
হেঁটে যাওয়া আবছা হয়েছে ততোই।কাউকে না চিনে হিম হয়ে আসা দাঁত
ময়ূরের ছুটে আসা শোনে... হোণ্ডাই , বলেরোর পিছনে ভাঙা সাইকেল দ হয়ে থাকে ...
ভাঙা সাইকেলেও সকাল আসে , হুড়মুড় কোরে।দুপুর ।রাতের
প্রার্থণা শুধু .. ভোর না হওয়ার । আজ আয়ুহীন করে দাও প্রভু – কর্কট সন্ন্যাসে..অথবা ত্রিশূল বেঁধাবার বুক ফালাফালা হোক অক্টোপাশেই ...যেন ষাট হাজার
কাঞ্চন ফুল বিষ হয়ে ওঠে ..
সকাল
এলেই চীৎকার আছড়ায় অরণ্যহীন , ফুলপাতা , নক্ষত্রবিহীন
চাঁদের পাহাড়ে ..পেরেক ঠুকে ঠুকে মড়া কাঠের ওপর আঁকা
হচ্ছে_ ফুল লতাপাতা ,
কখনো হাত ধরাধরি করা ফানুসের পা ।রাস্তার ধারে ধারে বাঁশের মাথায় আলো পোঁতা হচ্ছে ।যা ছেঁড়া জামায় এসে পৌঁছায় না
কোনোদিন ।পেট ফুলে উঠছে হাওয়া আর জলে।কাশফুল ঝরে ঝরে কবেই
বরফের প্রাণ ।মাদাম
তুঁসো কি এমন বানাতে পারেন
?।তবু আকাশ উড়ছে না ।নড়াচড়া হেঁট হয়ে আছে
।আর গজপতি ,
মুক্তোরমালা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাঁদরের সন্ধানে .. মাঝে মাঝেই
ভুলে যাই , ভূত হয়ে ফিরে এসেছি আমি ।তাই চারপাশের সবকিছুই কিম্ভূত
আর বিদঘুটে লাগে ।ভয়ে আয়নার সামনে যাই না, যদি বিকলাঙ্গ মানুষের ছায়া ভেসে ওঠে !যখন ভালো থাকি কবিতা ইচ্ছে পায় না । মাথার ওপর প্লেনের নাগাল খোঁজা , ঘুমিয়ে
থাকে । কি বোর্ডে বোতাম ঘুরে ঘুরে। ভূতের উপদ্রব বাড়ে । রাতে । রাহাত আলির'
ইয়ে জাঁহা' ক্লান্ত হয় ।আমি হাতল ভাঙা হয়ে আধ ঘুমে
।যেখানে
শব্দ নেই । অক্ষর নেই... গণেশের ওলটানো রূপ ।মাটিময় চিৎকার
কামড়ে ধরেছে।তারা গুনবার ছলে আলোর কদমগাছ ..লাল-সবুজের রোশনাই মিথ্যুক খুব ।বাঁ
চোখের ঘুম নেমে এসো আরো তারাবাজি উঠবার আগে ....
আমাদের হাতেখড়ি
শেষ...ওগো সবুজ দোলনা
গোবর ও কাদায়
মাখা মূর্তি উঠে এসেছেন হাতে ঘেঁটু ফুল নিয়ে । দেবী জ্ঞানে তাঁকে ঘিরেই ছড়ানো ছিটানো কাকের উৎসব । পচা
ভাতের গন্ধ ।অভাব নেই কারো ।আঙ্গুলে ৫৫৫ রিং
।আর - বন্দনা গান আরো ।হলদিরাম বদলে গেছে পাতার রঙে ।শুধু ক্লোরোফিলই নেই....ছেঁড়া বাঁশপাতাও উড়তে
উড়তে শালপাতা ভেবে নেয় নিজেকে । অথবা ফানুস । আসলে ছেঁড়া ঘুড়ির মতো লাট খাওয়াটাই দস্তুর ।নতুন কায়দা কৌশল আসলে
নতুন নয় সেও মান্ধার আমল ।কাটাকুটি আর ছক পালটালেও
মাটি টেনে নেয় সব । কিম্বা সব মাটি ।শিং উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ানো অহংকারী বুনো মোষকে
দেখে তখন ঘরের কোনে খুঁটি বাঁধা অজের সাধ হয় ওরকম
।কিন্তু উঁচু,অনেক উঁচুতেই থাকে ।কেরামত দর্জির ফিতেও নাগালে আসে না ।সাইকেলে কিলোমিটার,মিটার শেষে সেন্টিমিটারে দোল খায় আমাদের ২ টাকা দরের হাততালি ।তবু খুঁটি বাঁধাই থাকে
খুঁটিতে...বাবলার উগ্র আর ঝাঁঝালো হলুদ ফুলের গন্ধ নাকে ঢুকে যায় যেতে যেতে ।মাটির রাস্তার দুপাশে পার্থেনিয়ামের অজস্র ঝোপ
।কলাবাগান ।সবুজের মাঝখানে সাদা সাদা বিষাক্ত ফোঁটা ।নদীর ধার ঘেঁসে
যাওয়াটা শেষ হতেই এক প্রকাণ্ড অশ্বত্থের ছায়ায় টান করে বাঁধা তাঁতের নরদ ।এক
কিশোরী তার মায়ের ওপাশে বসে কাঁচির আগায় সুতো কেটে কেটে স্পষ্ট ফুটিয়ে
তুলছে টাঙ্গাইলের রঙিন নক্সা ।সারাদিনে একটা
সম্পূর্ণ কাপড়ের অবাঞ্ছিত সুতো কেটে ৪০ টাকা পাওয়া যায় ।পড়াশোনার ফাঁকে মাকে সাহায্য করতে হয় এমনি ভাবেই ।শুধু ভয়,কখন নরম আঙুল ছুঁয়ে নেবে না তো
কাঁচির ফলা ! যখন চাঁদ ঢেকে নিল ছোট্ট এক টুকরো কালো মেঘ ।মৃদু মৃদু বিদ্যুতের ঝলকানি মেঘের আড়ালে ।অথচ
অন্য প্রান্তে জোৎস্না ।তারায় ভরা আকাশ ।তখন মাঝরাত ।আমি গঙ্গার ধারে বসে এই সব হেঁয়ালির মাঝে । একটু দুরেই নৌকাবিলাস ।শেফালি কীর্তনিয়ার সুর
ভেসে আসছে । কখন সেই টুকরো মেঘ ছেয়ে ফেলেছে সমস্ত আকাশ । ক'ফোঁটা বৃষ্টি ঝরে পড়ল
যেন ... মিশে যাচ্ছে শিরীষ ফুল আর মাটির সোঁদা গন্ধ ।মাঝে মাঝেই ঝাঁপসায় হারিয়েছে কিছু
মুখ ।মনে এলেও খুঁজে আসে না ।বিশ্বাস হয় না , তাঁদের আর পাওয়া যাবে না কোনোদিন , কোনোখানেই ।কোনোদিন এই
ঝাঁপসা বৃষ্টিই আয়নায় চকচক করে উঠবে না ...শরতের মতো । তবু কোনোদিন কোনো খানে টুকরো কাঁচের ছবি হীরের ঝলক
আনে ।কাল দশহরা
।আমাদের গ্রাম থেকে একটু দুরেই গঙ্গার ধারে মেলা বসে প্রতি বছর ।এ বছরেও নেমতন্ন করে গেল দিলীপ ।ছোটো বেলায় খুব
যেতাম ।এখন আর যাওয়া হয়ে না ।তখন তো পাকা রাস্তা হয় নি হাঁটু পর্যন্ত
কাদা ভেঙে যেতে হত ৭/৮ বছর বয়সে । আর ঐ দিন বৃষ্টি তো হবেই ।বাঁশের
দামাটওয়ালা ছাতা বগলে নিয়ে বট-ঠাকুমার পেছন পেছন ।ছিপছিপ জলের ফোঁটা
ভিজিয়ে দিত লম্বা চুল । তবু খুলতাম না । সদ্য কিনে আনা নতুন ছাতা । তখনই
প্রথম দেখেছিলাম কচার বেড়া ডিঙিয়ে দ্রুতগামী সবুজ সাপ ।অবাক চোখে ।সাপও সবুজ রঙের হয় !
ভিজে হাওয়া আর
বৃষ্টির ছাট জানালা পেরিয়ে আসছে ।ভি.ভি.আই.পির সামনে জ্বলে ওঠা ফ্ল্যাশের মতন মুহুর্মুহু ঝলসানি ।এমন
দিনেও মুকুজ্জের আসার সময় হলো না !আস্ত শিমুলও উপড়ে
ছিল কদিন আগেই... সাদা সাদা বরফের চাঁইয়ের অজস্র ধারায় আমের দেখা মিলল না এ গাঁয়ে এ বছর ।বৃষ্টি ঝেঁপে
আসার সঙ্গে মেপে ধান দেবার
কৃপণতা দৃষ্টিকটুই দেখায় ...
সাধের দোতরা
নবীন বয়সে আমায়
করলি ঘর রে ছাড়া ।
গলি পেরতেই চিকন গলায় ভেসে এলো ।বসিরুদ্দির মাটির এক চালার দাওয়ায় আলুয়ায়িত তন্বী ।মাজা রঙ ।তবে সে রাখি নয় ।রাখির গলা আরও
মিঠা ।আমার খুবই পরিচিত সে সুর ।জিয়ারত মাস্টার যখন প্রথম
পালা বাঁধে নয়নমালা রাখি তখন ষোড়শীই বলা চলে
।হিঁদুর মেয়ে হয়ে পঞ্চরসের গায়িকা হবে হরেন ঘোষ ঠিক মেনে নিতে পারে নি
।জিয়ারত অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে রাজি করায় । অভাবের সংসার ।হরেন শেষ পর্যন্ত
নিমরাজি না হয়ে পারে নি ।জিয়ারতের খালাতো ভাই মনসুরের কাজ ছিল রোজ সাইকেলে চাপিয়ে
রাখিকে পদ্মমালায় পৌঁছে দেবার এবং নিয়ে আসার ।দলে অর্গান বাজাতো মনসুর ।তারপর
....... মাঝে মাঝে ভাবি - আমায় আর নতুন করে কবিতা না লিখলেও চলে ।
অনেকেই তো লিখছেন ।অজস্র কবি । অজস্র পত্রিকা ।ওয়েবজিন ।যদি না ই
থাকি এই সব ভিড়ে.....ঠিক করেছি - আর বই নয় । কবিতা নয় ।